মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে অতর্কিত হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ৫০ হাজার ঘুমন্ত বাঙালিকে হত্যা করে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। ইতিহাসে এটি এক ঘৃণ্য ও অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া পৃথক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৫ মার্চের গণহত্যার শিকার মানুষদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। তারা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
এদিকে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও পূর্বঘোষিত প্রতীকী ‘ব্ল্যাকআউট’ কর্মসূচি এবার পালন করা হচ্ছে না। আজ বুধবার রাত ১০টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত এক মিনিটের জন্য সারাদেশে ব্ল্যাকআউট করার ঘোষণা দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
দিবসটি উপলক্ষে দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে ২৫ মার্চের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। সকাল ১০টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ব্যবস্থাপনায় একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দুপুর ১২টা থেকে ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় গণহত্যাবিষয়ক আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি টিভি ও রেডিও চ্যানেল দিবসটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করবে। এছাড়া বাদ জোহর বা সুবিধাজনক সময়ে ২৫ মার্চ রাতে নিহতদের স্মরণে সারাদেশের মসজিদে বিশেষ মোনাজাত এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দিবসটির পবিত্রতা ও গাম্ভীর্য রক্ষায় এদিন রাতে দেশের কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা বেসরকারি ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা যাবে না।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর স্বাধীনতার আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। বাঙালির আন্দোলন দমন করতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে ২৫ মার্চ রাতে। সে অভিযানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, রমনা কালীমন্দিরসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। চট্টগ্রামসহ দেশের আরও কয়েকটি বড় শহরেও একই ধরনের নৃশংসতা ঘটে।
এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের আগমুহূর্তে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং প্রায় ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
২৫ মার্চের কালরাত স্মরণে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের উদ্যোগেও সারাদেশে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্মৃতি চিরন্তন’ চত্বরে সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় মোমবাতি প্রজ্বালন ও শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। এরপর ডকুমেন্টারি প্রদর্শন এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
পর্বতারোহী সংগঠন অভিযাত্রী ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যৌথ উদ্যোগে ‘শোক থেকে শক্তি: অদম্য পদযাত্রা’ আয়োজন করা হয়েছে। ভোর ৬টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে এই পদযাত্রা সন্ধ্যায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে শেষ হবে।
এছাড়া উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তোপখানা রোডের সত্যেন সেন চত্বর থেকে শিখা চিরন্তন পর্যন্ত আলোর মিছিল, কবিতা আবৃত্তি, গান এবং ‘গণহত্যা: দেশে দেশে-কালে কালে’ শীর্ষক আর্ট ইনস্টলেশন পরিবেশন করা হবে। বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।