সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কম বয়সে অঝোরে চুল ঝরছে? নেপথ্যে জিন নাকি আপনারই ভুল জীবনযাপন?


বিশ বা তিরিশ পেরোতেই বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের মাথার চুল ঝরে যাওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বংশগত ধারা, জীবনযাত্রার অনিয়ম, মানসিক চাপ ও হরমোনের জটিলতায় কম বয়সেই টাক পড়ার মুখে পড়ছেন তাঁরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক কোনো কারণে নয়, বরং পারিপার্শ্বিক ও জৈবিক নানা জটিলতার মিলিত রূপই এই অকাল চুল ঝরার মূল কারণ।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ 

কম বয়সে অঝোরে চুল ঝরছে? নেপথ্যে জিন নাকি আপনারই ভুল জীবনযাপন?
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

ত্রিশ বা চল্লিশ পেরোনোর আগেই মাথার সামনের চুল পেছনের দিকে সরে যাওয়া কিংবা মাঝের অংশ ফাঁকা হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছেন বর্তমান প্রজন্মের একটা বড় অংশ। আগে বয়সের ছাপ হিসেবে চুল পড়াকে দেখা হলেও, এখন টিনএজ বা বিশের কোঠাতেই তরুণেরা এই সংকটের মুখে পড়ছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, চুল ঝরে পড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং বংশগত ধারা, জীবনযাত্রার ধরন এবং পারিপার্শ্বিক চাপ মিলে তৈরি করছে এক জটিল পরিস্থিতি।

কর্মব্যস্ততা ও মানসিক চাপ

পড়াশোনার চাপ, প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্র এবং অনিয়মিত জীবনযাপন তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি আঘাত হানছে চুলে। অতিরিক্ত মানসিক উদ্বেগ বা বড় কোনো অসুস্থতা চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দেয়।চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলা হয় ‘টেলোজেন এফ্লুভিয়াম’। এই সমস্যায় স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি চুল একসঙ্গে বিশ্রাম বা ঝরে পড়ার পর্যায়ে চলে যায়। বিশেষ বিষয় হলো, মানসিক চাপ বা বড় কোনো শারীরিক ধাক্কা সামলে ওঠার কয়েক মাস পর চুল পড়া শুরু হয়। ফলে অনেকেই আসল কারণের সঙ্গে চুল ঝরার যোগসূত্র খুঁজে পান না।

ক্রিয়েটিন এবং শরীরচর্চার প্রচলিত গুঞ্জন

জিম বা শরীরচর্চা করেন এমন তরুণদের মধ্যে মাসল তৈরির উপাদান হিসেবে ক্রিয়েটিনের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়। ক্রিয়েটিন সরাসরি চুল ঝরায় কি না- এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। কিছু পুরনো গবেষণায় ক্রিয়েটিনের কারণে রক্তে ডিএইচটি হরমোনের মাত্রায় সামান্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিললেও, এটি ক্লিনিক্যালি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সরাসরি চুল পড়ার জন্য দায়ী- এমন জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো মেলেনি। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, যাদের পরিবারে অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তারা যে কোনো সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার সময় চুল বা মাথার ত্বকের পরিবর্তনে বাড়তি সতর্ক থাকতে পারেন।

বংশগত ধারা ও হরমোনের প্রভাব

তরুণদের টাক পড়ার প্রধান নেপথ্যে রয়েছে জিনগত কারণ বা অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়া। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, বংশে এই প্রবণতা থাকলে চুলের গোড়া অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের, বিশেষ করে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন বা ডিএইচটি-এর প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।এর ফলে চুলের ফলিকল বা গোড়াগুলো ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হতে থাকে। সময়ের সঙ্গে চুলগুলো পাতলা ও দুর্বল হয়ে ঝরে পড়ে। অনেকেরই ধারণা এই প্রবণতা কেবল মায়ের পরিবার থেকে আসে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল; বাবা কিংবা মা- উভয় দিক থেকেই এই জিন সন্তানের মধ্যে প্রবাহিত হতে পারে।

খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির সমীকরণ

দেহ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে চুল শরীরের কোনো অত্যাবশ্যকীয় বা জীবন রক্ষাকারী অঙ্গ নয়। ফলে খাদ্যে পুষ্টির ঘাটতি বা কঠোর ডায়েটের কারণে শরীরে পুষ্টির অভাব দেখা দিলে শরীর চুল বাদ দিয়ে অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর পুষ্টি নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেয়। বিশেষ করে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও আয়রনের অভাব চুলকে দুর্বল করে তোলে। তবে চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা- শরীর খারাপ বা চুল পড়ছে মানেই নিজে নিজে যেকোনো পুষ্টি-পরিপূরক বা ভিটামিন খাওয়া শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

চুল পড়ার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি মাথার ত্বকের গভীরে হেয়ার ফলিকলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। রোগীর ধরন বুঝে বিশেষজ্ঞরা ওষুধ, লোশন ছাড়াও বর্তমানে পিআরপি বা মেসোথেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে থাকেন। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, চুলের চিকিৎসায় দ্রুত কোনো জাদুকরী সমাধান নেই; এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস।