বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাঁচ অধ্যায়ে বিভক্ত নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার, বৈষম্যহীন উন্নয়ন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম–সমাজ–সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ- এই পাঁচ স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে ইশতেহার উপস্থাপন করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেন।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৮:১২ অপরাহ্ণ 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন- সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

শুক্রবার বিকেলে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইশতেহার ঘোষণা করেন। ইশতেহারে বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট উত্তরণে বিএনপির পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়।

ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা সমুন্নত রাখা, সাংবিধানিক সংস্কার, জাতীয় ঐক্য গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, পুলিশ সংস্কার এবং শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার, নারী ক্ষমতায়ন, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিক ও প্রবাসী কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারের তৃতীয় অধ্যায়ে ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কার, শিল্প ও সেবা খাতের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ, পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

চতুর্থ অধ্যায়ে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা, হাওর-বাঁওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন ব্যবস্থা উন্নয়ন, নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা বিনির্মাণ এবং পর্যটন খাতের বিকাশের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ইশতেহারের পঞ্চম ও শেষ অধ্যায়ে ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা, পাহাড় ও সমতলের জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিতকরণ, ক্রীড়া উন্নয়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা এবং সমাজে নৈতিকতার শক্ত পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করা হয়েছে এই অধ্যায়ে।

বিএনপির ইশতেহারে যে নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো-

১. প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।

২. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষিখাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।

৩. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবাসহ রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।

৪. আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।

৫. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণসহ মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

৬. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা–উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠায়ো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।

৭. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যামে ১০ হাজার কিলোমিটার নদী–খালখনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।

৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।

৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিষ্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন, ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই ইশতেহার জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।