মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

‘মুখ ও মুখোশ’-এর ৭০ বছর: যে চলচ্চিত্রের হাত ধরে শুরু হয়েছিল ঢাকাই সিনেমার যাত্রা


বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তির ৭০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ছবিটি শুধু একটি সিনেমাই নয়, বরং দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভিত্তি স্থাপনের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

৩ আগস্ট ২০২৬, ৯:১০ অপরাহ্ণ 

‘মুখ ও মুখোশ’-এর ৭০ বছর: যে চলচ্চিত্রের হাত ধরে শুরু হয়েছিল ঢাকাই সিনেমার যাত্রা
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক ‘মুখ ও মুখোশ’। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সবাক চলচ্চিত্রটি মুক্তির মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকাই চলচ্চিত্র। সোমবার (৩ আগস্ট) সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ৭০ বছর পূর্ণ হয়েছে।

সাত দশক আগে এই দিনে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ছবিটির উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন আবদুল জব্বার খাঁ।

‘মুখ ও মুখোশ’-এর জন্ম হয়েছিল এক সাহসী চ্যালেঞ্জ থেকে। ১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে আয়োজিত এক সভায় দাবি করা হয়েছিল, এ অঞ্চলের আর্দ্র আবহাওয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়। সেই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে আবদুল জব্বার খাঁ নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেন। চলচ্চিত্র নির্মাণে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও নিজের লেখা ‘ডাকাত’ নাটক অবলম্বনে চিত্রনাট্য তৈরি করে কাজ শুরু করেন তিনি।

কলকাতা থেকে সংগ্রহ করা একটি পুরোনো আইমো ক্যামেরা ও সাধারণ টেপ রেকর্ডারের সাহায্যে শুরু হয় শুটিং। নারীশিল্পীর সংকট কাটাতে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে অভিনেত্রী নির্বাচন করা হয়। ছবিতে কুলসুম চরিত্রে অভিনয় করেন পূর্ণিমা সেনগুপ্ত এবং পরিচালক আবদুল জব্বার খাঁ নিজেই নায়ক আফজালের ভূমিকায় অভিনয় করেন।

বুড়িগঙ্গার ওপারের কালীগঞ্জ, লালমাটিয়া, তেজগাঁও, জিঞ্জিরা এবং টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে ছবিটির শুটিং সম্পন্ন হয়। ১৯৫৫ সালের ৩০ অক্টোবর শুটিং শেষ হওয়ার পর সম্পাদনা ও প্রিন্টের কাজ করা হয় লাহোরের শাহনুর স্টুডিওতে।

প্রথমদিকে ঢাকার পরিবেশকরা ছবিটি মুক্তিতে আগ্রহ না দেখালেও পরে ‘পাকিস্তান ফিল্ম ট্রাস্ট’ ও ‘পাকিস্তান ফিল্ম সার্ভিস’ পরিবেশনার দায়িত্ব নেয়। রূপমহল সিনেমা হলে উদ্বোধনী প্রদর্শনীর পাশাপাশি চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনাতেও একযোগে মুক্তি পায় ছবিটি। দর্শকদের ব্যাপক সাড়া প্রমাণ করে, বাংলার মাটিতেও সফলভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব। আর সেই সাফল্যের মধ্য দিয়েই রচিত হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের নতুন ইতিহাস।

ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেন সমর দাস। গান পরিবেশন করেন মাহবুবা হাসনাত ও আবদুল আলীম। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন গওহর জামিল। ‘মুখ ও মুখোশ’-এর ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ২ আগস্ট চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে বাংলা চলচ্চিত্রের পোস্টার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীতে দেশের বিভিন্ন সময়ের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত জনপ্রিয় সিনেমার পোস্টারও স্থান পায়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াৎ, মতিন রহমান, অভিনেতা সোহেল আরমানসহ চলচ্চিত্রাঙ্গনের বিশিষ্টজনরা।

চলচ্চিত্র সাংবাদিক আবদুর রহমান জানান, ১৯৫৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাংলা চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। তবে ২০০০ সালের পর থেকে চলচ্চিত্রশিল্পে মন্দা শুরু হয়। একসময় দেশে প্রায় ১ হাজার ৭০০টি সিনেমা হল থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০টি। বড় উৎসবের সময় এ সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮০টির কাছাকাছি পৌঁছায়। বাংলা চলচ্চিত্রের ৭০ বছরের ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি বর্তমানের সংকটও বাস্তব। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াৎ বলেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে দর্শকদের সিনেমা দেখার মাধ্যম বদলেছে, তবে চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। তার মতে, সিনেমা কখনো বিলীন হবে না। সরকার যদি সারা দেশে আরও সিনেপ্লেক্স নির্মাণে সহায়তা করে, তাহলে বাংলা চলচ্চিত্র আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।