‘নৌকা’ প্রতীক স্থগিত, একক প্রার্থীর জন্য যুক্ত হলো ‘না’ প্রতীক
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ
প্রদর্শনী শেষে প্রেক্ষাগৃহের আলো জ্বলে উঠলেও অনেক দর্শক যেন তখনও সিনেমার গল্পের আবেশে ছিলেন। কারও চোখে বিস্ময়, কারও মুখে প্রশংসা। কেউ কথা বলেছেন নারীর মুক্তি নিয়ে, আবার কেউ সৌন্দর্যের নামে নারীর ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে ভাবনার কথা জানিয়েছেন।
রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত সিনেমাটি টিআইএফএফের ৫১তম আসরের সেন্টারপিস বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। উৎসবে প্রদর্শিত প্রায় ৩০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে বাংলাদেশের এই সিনেমাটি দেখতে বিভিন্ন দেশের দর্শকদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় রাত ১০টায় টিআইএফএফ লাইটবক্সে সিনেমাটির দ্বিতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) মশিয়ন ব্যাং প্রেক্ষাগৃহে হওয়ার কথা রয়েছে আরও একটি প্রদর্শনী। কানাডায় বেড়াতে এসে টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের অভিজ্ঞতা নিতে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ দেখতে এসেছিলেন আমেরিকান তরুণ জন। সিনেমাটি দেখে তাঁর কাছে এটি একই সঙ্গে ভৌতিক এবং চিন্তার খোরাক জোগানো একটি চলচ্চিত্র মনে হয়েছে। জন বলেন, ভুতুড়ে কনের দৃশ্যগুলো দেখার পরও তিনি সেগুলো নিয়ে ভাবছেন।
সিনেমার ভৌতিক আবহের চেয়েও নিজের মনের কথা শোনার বিষয়টি তাঁকে বেশি নাড়া দিয়েছে বলেও জানান জন। তাঁর মতে, জীবনে কখনো কখনো সংস্কৃতি বা পরিবারের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়েও নিজের অন্তর্দৃষ্টি ও মনের কথা অনুসরণ করা জরুরি। কানাডীয় তরুণী জে সিনেমাটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হিসেবে দেখেছেন নারীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে। তাঁর কাছে গল্পের উচ্চবিত্ত তরুণী চরিত্রটি ছিল ‘সোনার খাঁচায় বন্দি’।
কানাডীয় দর্শক সুজান স্মিথের চোখে সিনেমাটি আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি ‘চোখ খুলে দেওয়ার মতো’। তিনি বলেন, নির্মাতা বাংলাদেশের শ্রেণিবৈষম্য নিয়েও কথা বলেছেন। বিশেষ করে সৌন্দর্য সম্পর্কে নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুন্দর হতে গিয়ে নারীরা কী কী করেন, তা সিনেমায় যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেটি তাঁর কাছে আকর্ষণীয় লেগেছে। একই সঙ্গে এতে ব্যঙ্গের উপাদানও রয়েছে বলে মনে হয়েছে তাঁর।
কানাডাপ্রবাসী নির্মাতা ও টরন্টো ফিল্ম স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী মেহেদির মতে, সিনেমাটির গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো নিজের শরীর ও চেহারাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। তাঁর ভাষায়, কনে কিংবা বর- যার চেহারা যেমন, তা নিয়েই স্বচ্ছন্দ থাকা উচিত। গায়ের রং বা শরীরের দাগকে শরীরের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করার বার্তাটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সাত বছর আগে, ২০১৯ সালে ৪৪তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এসেছিলেন রুবাইয়াত হোসেন। সে সময় কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ড সিনেমা বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছিল তাঁর সিনেমা ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। সাত বছর পর একই উৎসবে আবারও ফিরেছেন তিনি, এবার ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নিয়ে।
এর আগে ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি বিভাগে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা হিসেবে প্রদর্শিত হয়ে আলোচনায় আসে চলচ্চিত্রটি। ভেনিস থেকে টরন্টো এসে নিজের সিনেমার প্রদর্শনী দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন নির্মাতা।
রুবাইয়াত হোসেন বলেন, টরন্টোতে সিনেমাটির তিনটি শো রয়েছে এবং সব কটির টিকিট সোল্ড আউট হয়েছে। প্রথম প্রদর্শনীতে প্রেক্ষাগৃহভর্তি দর্শক ছিলেন এবং প্রদর্শনী শেষে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অনেক বাংলাদেশি দর্শকের উপস্থিতিও ছিল।
টিআইএফএফের দর্শকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে শত শত চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় এবং পুরো আয়োজনটি অনেকটা কনফারেন্স বা কনভেনশনের মতো। বিভিন্ন বয়সের মানুষ সারা বছর এই উৎসবের জন্য অপেক্ষা করেন এবং উৎসবে এসে সিনেমা দেখেন।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এ টিকটিকি, সাপ, কেঁচো ও শামুকের মতো প্রাণীর উপস্থিতি দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে নির্মাতা জানান, এসব প্রাণী কোনো সরল প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। বরং দর্শকের শরীর ও মনে একটি বিশেষ অনুভূতি তৈরি করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
রুবাইয়াত হোসেন বলেন, সিনেমাটি দেখার পর দর্শক যেন নিজের শরীরে কিছু একটা অনুভব করেন—এটাই তাঁর চাওয়া ছিল। ক্লোজআপে শামুক, কেঁচো বা টিকটিকি দেখলে মানুষের মধ্যে যে এক ধরনের স্পন্দন তৈরি হয়, সেটিই তিনি কাজে লাগাতে চেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর মাধ্যমে সিনেমাটিকে বিশ্বের আরও দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে চান নির্মাতা। ভেনিস ও টরন্টোর পর ধাপে ধাপে সিনেমাটি বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসব ও শিকাগোতেও নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সিনেমাটির গল্প বাংলাদেশের হলেও এর সংগীতেও রয়েছে প্রবাসী এক বাংলাদেশি তরুণের অবদান। ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর সংগীত পরিচালনা করেছেন কানাডাপ্রবাসী দামীর খান। তাঁর দাদাবাড়ি চট্টগ্রামে এবং নানাবাড়ি বরিশালে। বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। এবারই প্রথম নিজের দেশের কোনো চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। সিনেমায় তাঁর সুর করা ও গাওয়া দুটি গান হলো ‘ঢাকা লাভ’ ও ‘বিলিভ’। টরন্টোতে উত্তর আমেরিকান প্রিমিয়ারের পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে দামীর খান বলেন, এত বড় মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পেরে তাঁর ভালো লাগছে।
সমকালীন ঢাকার একটি বিউটি সেলুনকে ঘিরে এগিয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর গল্প। বিয়ের আগে একজন নারীর শরীরকে ‘সুন্দর’ করে তোলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সিনেমাটি সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণা, আকাঙ্ক্ষা, নারীর শরীরের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বাস্তবতার সঙ্গে হরর, অতিপ্রাকৃত উপাদান ও দক্ষিণ এশীয় লোকবিশ্বাসের মিশেলে তৈরি হয়েছে সিনেমাটির নিজস্ব আবহ। বিয়েকে কেন্দ্র করে সৌন্দর্যচর্চার সামাজিক আয়োজন ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক ভয়ের অভিজ্ঞতায়। সেই ভয় কেবল অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির নয়; বরং মানুষের তৈরি নিয়ম, প্রত্যাশা ও নিয়ন্ত্রণেরও।
সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নবাগতা জাইনীন চৌধুরী করিম। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম ও মোহাম্মদ ধীরি। অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান।