বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

এবার সয়াবিন তেলে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত


রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা সয়াবিন তেলের নমুনায় উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি লিটার তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি প্লাস্টিক কণা রয়েছে, যার পরিমাণ বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা তেলে আরও বেশি।

২৯ জুলাই ২০২৬, ১০:০৬ পূর্বাহ্ণ 

এবার সয়াবিন তেলে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) এক যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা সয়াবিন তেলে দূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষণার জন্য ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সুপারশপ এবং খোলা বাজার থেকে মোট ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনা সংগ্রহ করে আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা বোতলজাত তেলের তুলনায় প্রায় ১.২৪ গুণ বেশি। তেজগাঁও এলাকা থেকে সংগ্রহ করা খোলা তেলের নমুনায় দূষণের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ। গবেষকদের মতে, শিল্পকারখানার ঘনত্ব, প্লাস্টিক ও টেক্সটাইল কারখানার নিকটবর্তী অবস্থান এবং একই পাত্র বারবার ব্যবহারের কারণে এ দূষণ বেড়ে থাকতে পারে।

ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণে তেলের নমুনাগুলোতে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে। এগুলো হলো- লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এলডিপিই), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এইচডিপিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি), পলিইউরেথেন (পিইউ) এবং নাইলন। গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি বিশ্বে এই প্রথম কোনো গবেষণায় শনাক্ত হলো।

শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল আঁশ বা ফাইবারজাতীয়। এছাড়া ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ কণা ছিল স্বচ্ছ এবং প্রায় ৩৬ শতাংশ কণার আকার ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটারের মধ্যে।

গবেষণায় মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের সম্ভাব্য মাত্রাও তুলে ধরা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দৈনিক গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও বেশি। তাদের শরীরে প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি প্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে। একটি শিশু তার জীবনকালে প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে বলেও গবেষণায় পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানুষের পরিপাকতন্ত্র, হরমোনের ভারসাম্য, প্রদাহ এবং কোষের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো রক্তপ্রবাহে প্রবেশের ঝুঁকি বহন করে।

গবেষণা দলের প্রধান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মুহাম্মদ তারেক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক বর্তমানে একটি উদীয়মান দূষক, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি প্লাস্টিক বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার বৃদ্ধি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

খোলা তেল বিক্রির ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, উন্নত মানের ফিল্টার ব্যবহার এবং খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এর আগে পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর এক গবেষণায় দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ওই গবেষণায় ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতে প্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছিল, যা দেশে খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।