সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ


২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দল শুধু ম্যাচই জেতেনি, লিখেছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন অধ্যায়। হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিং, তানজিদ হাসান তামিমের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি ও মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে চার দিনেই জয় নিশ্চিত করে টাইগাররা।

১৬ আগস্ট ২০২৬, ৩:০৫ অপরাহ্ণ 

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

টেস্ট ক্রিকেটে দুই দলের শক্তির পার্থক্যটা বরাবরই বিশাল। র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ যেখানে নবম, অস্ট্রেলিয়া সেখানে শীর্ষে। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। এরপর কেটে গেছে প্রায় ২৩ বছর। বদলেছে প্রজন্ম, বদলেছে ক্রিকেটের বাস্তবতা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবারও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়ে এবার ইতিহাসই গড়ল বাংলাদেশ।

ডারউইনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য ছিল মাত্র ৫৭ রান। ছোট লক্ষ্য হলেও শুরুতেই ধাক্কা খায় টাইগাররা। জশ হ্যাজেলউডের বলে শূন্য রানে বোল্ড হয়ে ফিরে যান তানজিদ হাসান তামিম। তবে সেই ধাক্কা আর বড় হতে দেননি মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম।

দ্বিতীয় উইকেটে অবিচ্ছিন্ন ৫৩ রানের জুটি গড়ে অনায়াসে বাংলাদেশকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন দুজন। মুমিনুল ৩০ ও সাদমান ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন। মাত্র ১৪.২ ওভারেই ১ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। ফলে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় পায় টাইগাররা। এটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় জয়। এর আগে ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।

প্রথম দিনেই জয়ের ভিত

বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ের ভিত তৈরি হয়েছিল ম্যাচের প্রথম দিনেই। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা অস্ট্রেলিয়াকে শুরু থেকেই চাপে রাখেন বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান মাহমুদের আগুনঝরা বোলিংয়ের সামনে মাত্র ১৯৮ রানেই গুটিয়ে যায় স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস।

মাত্র ১৭ ওভারে ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন হাসান মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটিই সেরা বোলিং। তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনও তাকে দারুণভাবে সঙ্গ দেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১০ উইকেটই তুলে নেন বাংলাদেশের পেসাররা।

তানজিদের ব্যাটে ইতিহাস

অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসের পর নিজেদের প্রথম ইনিংসে দারুণ জবাব দেয় বাংলাদেশ। মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নামা তানজিদ হাসান তামিম অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে শুরুতে সতর্ক থাকলেও পরে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসেন।

১৯৭ বলে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন বাঁহাতি এই ওপেনার। আটটি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো ইনিংসটি ছিল তার ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের এটিই প্রথম টেস্ট শতক।

তানজিদের সঙ্গে ১০২ রানের জুটি গড়ে বাংলাদেশকে শক্ত ভিত এনে দেন মুমিনুল হক। এরপর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ ও মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসে আরও বড় হয় বাংলাদেশের সংগ্রহ। শেষ পর্যন্ত ৪২৬ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ২২৮ রানের বিশাল লিড পায় তারা।

গ্রিনের সেঞ্চুরিও বাঁচাতে পারেনি অস্ট্রেলিয়াকে

২৮৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমেও শুরুতে বাংলাদেশের পেসারদের সামনে বিপাকে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংনের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও জেক ওয়েদারাল্ড ও ট্রাভিস হেডকে ফিরিয়ে দেন হাসান মাহমুদ। তবে এরপর প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডারের ব্যাটাররা। মার্নাস লাবুশেন করেন ৩১ এবং স্টিভেন স্মিথ ৪৪ রান। এরপর একাই লড়াই চালিয়ে যান ক্যামেরন গ্রিন। ১৯২ বলে ১০৪ রানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করেন গ্রিন। তার ব্যাটে ভর করে দ্বিতীয় ইনিংসে লড়াইয়ের অবস্থানে পৌঁছায় অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা শেষ পর্যন্ত চাপ ধরে রাখেন।

বিশেষ করে মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণিতে একে একে ফিরে যান অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটাররা। প্যাট কামিন্স, অ্যালেক্স ক্যারি, বিউ ওয়েবস্টার ও নাথান লায়নকে শিকার করেন মিরাজ। শেষ পর্যন্ত ৬৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস গুটিয়ে দেন তিনি। হাসান মাহমুদ নেন ৩ উইকেট। তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলাম নেন একটি করে উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস থামে ২৮৪ রানে। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।

২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান

শেষ পর্যন্ত মুমিনুল ও সাদমানের ব্যাটে সেই ছোট লক্ষ্যও পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ। ডারউইনের আকাশে উড়তে থাকে বাংলাদেশের পতাকা। ২৩ বছর আগে যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ, সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই এবার স্বাগতিকদের হারিয়ে দিল টাইগাররা।

হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট, তানজিদ হাসান তামিমের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি এবং মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে পাওয়া এই জয় তাই শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের জয় নয়। দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের নতুন গল্পের সূচনা হলো ডারউইনে।