শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

গেজেট প্রকাশিত অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন: নজরদারি ও নৈতিক মানদণ্ড জোরদার


সরকার অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন সংশোধন ২০২৫–এর গেজেট প্রকাশ করেছে, যা দাতা সংজ্ঞা, প্রতিস্থাপনের অনুমোদন, চিকিৎসকের যোগ্যতা, সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট ও ক্যাডেভারিক দানসহ সব ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আনে। নতুন আইনে ইমোশনাল ডোনর অন্তর্ভুক্তি, ব্রেন ডেথের স্পষ্ট সংজ্ঞা, জাতীয় রেজিস্ট্রি, কঠোর স্ক্রিনিং এবং সার্জন ও হাসপাতালের জন্য কঠোর মানদণ্ড জোরদার করা হয়েছে। অঙ্গ বিক্রি, জোরপূর্বক দান, দালালি ও অবৈধ প্রতিস্থাপনে কঠোর শাস্তি ও আর্থিক জরিমানা প্রবর্তিত হয়েছে, যাতে অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরাপদ হয়।

২০ নভেম্বর ২০২৫, ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ 

গেজেট প্রকাশিত অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন: নজরদারি ও নৈতিক মানদণ্ড জোরদার
  গুগল নিউজে ফলো করে আজকের প্রসঙ্গ এর সাথে থাকুন

অঙ্গ প্রতিস্থাপনে অনিয়ম, জালিয়াতি ও বাণিজ্যিক দৌরাত্ম্য রোধে সরকার অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন সংশোধন ২০২৫–এর গেজেট প্রকাশ করেছে। বুধবার আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয় মুদ্রণ শাখা থেকে প্রকাশিত এ গেজেটে দাতা নির্বাচন থেকে সার্জনদের যোগ্যতা ও জাতীয় রেজিস্ট্রি গঠন পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

দাতার নতুন সংজ্ঞা: রক্ত–সম্পর্কের বাইরে বিস্তৃত কাঠামো

নতুন আইনে দাতাকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—

বায়োলজিক্যাল বা জেনেটিক ডোনর,

ইমোশনাল ডোনর (স্বামী–স্ত্রী, দত্তক, দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব বা সামাজিক সম্পর্ক),

ক্যাডেভারিক ডোনর (আইনগতভাবে মৃত ব্যক্তির অঙ্গ দান)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইমোশনাল ডোনরের অন্তর্ভুক্তি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এখানেই ভবিষ্যতে অনিয়মের ঝুঁকি বেশি। তাই কঠোর মনস্তাত্ত্বিক যাচাই ও নৈতিক কমিটির অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ব্রেন ডেথ’ সংজ্ঞায় স্পষ্টতা

প্রথমবারের মতো ক্যাডেভারিক দানের জন্য ব্রেন ডেথের বিস্তারিত চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। মস্তিষ্কের স্থায়ী কার্যহীনতা, রিফ্লেক্স অনুপস্থিতি, কোমা অবস্থা ও কৃত্রিম শ্বাস–প্রশ্বাসে টিকে থাকা—এসব বিষয় সরকারি অনুমোদিত ডেথ সার্টিফিকেশন বোর্ড নিশ্চিত করবে।

সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট এখন আইনগতভাবে বৈধ

রক্ত–গ্রুপ বা ম্যাচিং না হলে দুই পরিবার বা দুই গ্রহীতার মধ্যে সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট আইনসিদ্ধ করা হয়েছে। তবে উভয়পক্ষকেই জাতীয় রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে এবং আর্থিক লেনদেন বা মধ্যস্থতা প্রমাণ পেলেই তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

জাতীয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন রেজিস্ট্রি গঠন

নতুন আইনে দাতা–গ্রহীতা, সার্জন, হাসপাতাল, সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট, নৈতিক কমিটির সিদ্ধান্ত ও ক্যাডেভারিক দানের সব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করে একটি একক জাতীয় রেজিস্ট্রি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটি সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকবে ও নিয়মিত অডিট হবে।

দাতা ও গ্রহীতার ক্ষেত্রে কঠোর মেডিকেল, মানসিক, আর্থসামাজিক ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

হাসপাতাল ও সার্জনের জন্য কঠোর মানদণ্ড

অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে হলে হাসপাতালগুলোকে বিশেষায়িত ইউনিট, আইসিইউ, আন্তর্জাতিক মানের অপারেশন থিয়েটার, টিস্যু–টাইপিং ল্যাব এবং অনুমোদিত সার্জনদের উপস্থিতিসহ কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। নৈতিক কমিটি ও ট্রান্সপ্লান্ট কো-অর্ডিনেটরও বাধ্যতামূলক।

অঙ্গ পাচার ও বাণিজ্যে কঠোর শাস্তি

অঙ্গ বিক্রি, জোরপূর্বক দান, দালালি, জাল নথি ব্যবহার ও অবৈধ প্রতিস্থাপনে কঠোর শাস্তির বিধান আনা হয়েছে।

অবৈধ প্রতিস্থাপনে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড,

জোরপূর্বক দানে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড,

দালালি বা মধ্যস্থতায় ফৌজদারি মামলা,

জালিয়াতিতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

মৃতদেহ দান উৎসাহিত, তবে বাধ্যতামূলক নয়

আইনে জীবদ্দশায় সম্মতি প্রদান বা মৃত্যুর পর স্বজনদের সম্মতিক্রমে অঙ্গ দানের সুযোগ রাখা হয়েছে। ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান বজায় রেখে এটি ক্যাডেভারিক ডোনেশন সংস্কৃতি বিস্তারে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।

সংশোধিত এই আইনকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একীভূত করার বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।