মিরপুরে ডিবির জালে ‘শ্যুটার জাকির’, দুই আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:৫৩ অপরাহ্ণ
কারাগারের চার দেয়ালের বন্দিজীবনে স্বজনদের সঙ্গে দেখা ও কথা বলার আকুলতা দূর করতে চালু হচ্ছে ভিডিও কলের বিশেষ সুবিধা। ইতোমধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কারাগারে এ সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করছে কারা অধিদপ্তর।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্দিষ্ট নিয়ম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে কয়েদি ও হাজতিরা সপ্তাহে একবার ১০ মিনিট করে ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাবেন। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
ঢাকা কারা অধিদপ্তরের জেলার (লজিস্টিক অ্যান্ড মিডিয়া) মো. মাসুদ হাসান জুয়েল রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, শিগগিরই সারা দেশের কারাবন্দিরা স্বজনদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সুযোগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে বন্দি ও পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, আধুনিক ও মানবিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনেও ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন কারাগারে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষা, কাউন্সেলিং এবং অন্যান্য মানসিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
মো. মাসুদ হাসান জুয়েল জানান, বন্দিদের উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য দক্ষ করে তোলার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ সাবান উৎপাদনের কার্যক্রম চলছে। সেখানে উৎপাদিত সাবান বন্দি ও কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতে বন্দিদের প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনমুখী কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বন্দিদের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কেরানীগঞ্জে একটি কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারা সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিকিৎসা পরীক্ষার জন্য একটি প্যাথলজি ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগের সুপারিশ পাওয়া গেছে। তাদের পদায়নের মাধ্যমে দেশের কারাগারগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে বন্দি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ মিনারেল ড্রিংকিং ওয়াটার প্লান্ট স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে সেখান থেকে পানি সরবরাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কারাগারের মৌলিক সেবাগুলোর মানোন্নয়নকে ভবিষ্যতেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, একটি আধুনিক কারা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল অপরিহার্য।
কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারারক্ষী, প্রধান কারারক্ষী, সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর, ডেপুটি জেলার, জেলার ও জেল সুপারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফারুক আহমেদ বলেন, বন্দিদের জন্য রুটি তৈরির কার্যক্রমকে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল করতে চীন থেকে আমদানি করা রুটি মেকার স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য একই মানের রুটি স্বাস্থ্যসম্মত ও দক্ষতার সঙ্গে প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা কমছে।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ দিবসগুলোতে বন্দিদের জন্য উন্নত খাবার পরিবেশনের লক্ষ্যে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন কারাগারে খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্দিদের পুনর্বাসন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল তৈরি এবং বেকারি প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। খেলাধুলার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় ও বিশেষ দিবস উপলক্ষে কারাগারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হচ্ছে।
কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা ছিল অবসর-পরবর্তী কল্যাণ নিশ্চিত করা। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের আজীবন রেশন দেওয়ার বিষয়টি সরকার নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। বর্তমানে এটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এ ছাড়া কারাগারের নিরাপত্তা রক্ষা, বন্দি পালানো প্রতিরোধ, অনিয়ম ঠেকানো, দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সেবা এবং দায়িত্ব পালনে অসাধারণ অবদান রাখা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ যথাযথভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যোগ্য সদস্যদের পদক, প্রশংসাপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করা হচ্ছে।
কারাগারে মাদক প্রবেশ ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে কারা অধিদপ্তর। এ লক্ষ্যে কারা সদর দপ্তরে ড্রাগ পরীক্ষার মেশিন সংগ্রহ করা হয়েছে, যা মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কারাগারকে স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলতেও নেওয়া হয়েছে সবুজায়ন কর্মসূচি। ইতোমধ্যে সিলেট-১, কিশোরগঞ্জ-১ ও খুলনা নতুন কারাগারে প্রায় ১৮ হাজার গাছ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের ভাষ্য, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ এবং ভালো কাজের যথাযথ স্বীকৃতির মাধ্যমে একটি আধুনিক ও পেশাদার সংশোধনমূলক সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে।
কারা কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কারাগার সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কারাগার হবে আরও নিরাপদ ও মানবিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হবেন দক্ষ ও মর্যাদাবান এবং বন্দিরা পাবেন সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর সুযোগ। একই সঙ্গে পুরো কারা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে কারা অধিদপ্তর।