এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ করতে চায় একটি মহল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:১০ অপরাহ্ণ
রাজনীতির ইতিহাসে যেসব নাম গভীর ছাপ রেখে গেছে, বেগম খালেদা জিয়া তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক, এক সময়ের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তাঁর রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদল, সংকট ও প্রতিরোধের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
শৈশব ও পারিবারিক জীবন:-
বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তুলনামূলকভাবে আড়ালে ও সাধারণ পারিবারিক পরিবেশে। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে মূলত তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে। জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা।
রাজনীতিতে প্রবেশ:-
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে সৃষ্টি হয় এক বড় শূন্যতা। সেই সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়েই তাঁর সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ। রাজনীতিতে তাঁর এই আগমন ছিল অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজেকে একজন দৃঢ় ও সংগঠক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার:-
১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান নেতৃত্ব। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। বহু আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি আপসহীন অবস্থান ধরে রাখেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনবার প্রধানমন্ত্রী:-
১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। তাঁর নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে আরও দুইবার তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, দারিদ্র্য হ্রাস ও বেসরকারি খাত বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ, আন্দোলন ও সমালোচনাও ছিল তাঁর শাসনামলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ১/১১ পরবর্তী সময়:-
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন মানেই তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি কঠিন সময়ের মুখোমুখি হন। সেই সময়ে গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মধ্য দিয়েও তিনি দলীয় নেতৃত্ব ধরে রাখেন।
মামলা, কারাবরণ ও শারীরিক অসুস্থতা:-
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকেন। বয়সজনিত ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। চিকিৎসা ও মুক্তি নিয়ে রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়ায়। এই সময়ে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও তাঁর উপস্থিতি ও নাম রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব বজায় রাখে।
নারী নেতৃত্ব ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব:-
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া এক ব্যতিক্রমী নারী নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি এমন এক সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে নারীদের জন্য ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো সহজ ছিল না। তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
বর্তমান সময় তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। বিএনপির রাজনীতি, আন্দোলন ও ভবিষ্যৎ কৌশলে তাঁর নাম এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন- যেখানে সংগ্রাম, ক্ষমতা ও প্রভাব একসাথে মিশে আছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়- বাংলাদেশের রাজনীতি তাঁর নাম ছাড়া অসম্পূর্ণ। তিনি ইতিহাসের এমন এক চরিত্র, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আলোচনায় থাকবেন